প্রজেক্ট ফ্রিডম

হরমুজে ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতে’ ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়েও আস্থাহীন শিপিং কোম্পানিগুলো

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

যদিও এ জলপথে আটকে পড়া জাহাজ বের করে আনার জন্য একটি বিশেষ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু জাহাজ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উদ্যোগটির স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শিপিং কোম্পানিগুলো বলছে, পরিস্থিতি এখনো খুব ঝুঁকিপূর্ণ। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ও বর্তমান পরিস্থিতি

ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া সব জাহাজকে নিরাপদে বের করে আনার জন্য ‘গাইড’ বা পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। ট্রাম্প এ অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’।

তবে ট্রাম্পের এ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। ইরানের ফার্স সংবাদ সংস্থা জানায়, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় ওই হামলা হয়েছে বলে দাবি করে ইরান। পরে জাহাজটি পিছু হটে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি অস্বীকার করেছে। এ ঘটনার পর পরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।

একই সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা ও উপসাগরীয় এলাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জাহাজে আগুন লাগার খবরও আসে। এতে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরো বেড়ে যায়।

জাহাজ শিল্পের উদ্বেগ ও প্রশ্ন

ট্রাম্পের পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকেই জাহাজ মালিক ও বিশেষজ্ঞরা নানা প্রশ্ন তুলছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, এরই মধ্যে দুটি মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। কিন্তু বিশালসংখ্যক আটকে পড়া জাহাজের ক্ষেত্রে এ নিরাপত্তা কতটুকু স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।

নাবিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন নটিলাসের মহাসচিব সাসচা মেইজার জানান, প্রণালিতে আটকে থাকা নাবিকরা অবশ্যই নিরাপত্তা চান। তারা জাহাজ নিয়ে নিরাপদে বের হতে চান। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? সেখানে মাইন পাতা আছে কিনা, জাহাজের বীমা কার্যকর থাকবে কিনা, এসব বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। তার মতে, পরিস্থিতি ভালো না খারাপের দিকে যাবে, তা এখনই বলা কঠিন।

হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা একটি তেলবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেন রমণ কাপুরও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিবিসি রেডিওকে তিনি জানান, একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা তার দায়িত্ব। শুধু নিজের সিদ্ধান্তে জাহাজ চালানো যায় না। পুরো নাবিক দলের সম্মতি নিতে হয়। কারণ সবার জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ট্রাম্প তার ঘোষণায় ঠিক কীভাবে আটকে থাকা ৮৫০টির বেশি জাহাজকে সরিয়ে নেয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তিনি শুধু জানান, যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে যাতে জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া যায়।

ট্রাম্প আরো বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট জাহাজ কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, নৌপথ পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত তারা এ এলাকায় ফিরতে চায় না। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পরিস্থিতি নিয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছে।’

বিশ্বের বড় শিপিং সংগঠন বিমকোর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিভাগের প্রধান জ্যাকব লারসেন বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রজেক্ট ফ্রিডম বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হতে পারে।

সেন্টকম জানিয়েছে, অভিযানটি যুক্তরাষ্ট্রের গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, শতাধিক যুদ্ধবিমান ও নজরদারি প্লাটফর্ম অংশ নেবে। পাশাপাশি প্রায় ১৫ হাজার সামরিক সদস্য মোতায়েন করা হবে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে দিনে বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহন হতো। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত শুরুর পর থেকে ওই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

এতে মূলত জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ ও নিত্যপণ্যের দামে। ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্য সরবরাহের প্রধান পথ এটি। তাই সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও